প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা:

স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই বরুড়াতে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ছিল ব্যাপক। তার কারণ হলো প্রায় শতাব্দী প্রাচীন বরুড়া দারুল উলুম মাদ্রাসা এবং পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত বরুড়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা। এখনো এ অঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষা বহুল সমাদৃত। আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে তখন ছিল শুধু পয়ালগাছা ডিগ্রী কলেজ। কিন্তু বরুড়ায় আধুনিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। তাই অত্র এলাকার ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে হতো পশ্চিমগাঁ কলেজ( বর্তমান নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ) কিংবা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ।

          এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালে তৎকালীন এম.পি জনাব আবদুল হাকিম বরুড়াতে ১৯৭১ এর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বরুড়া শহীদ স্মৃতি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। কোন বৃহৎ কাজ যেমন কোন ব্যক্তির একার পক্ষে সম্ভব নয় তেমনি এ কাজটিও তাঁর একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ সময় তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান দুই মহান শিক্ষানুরাগী বরইয়া গ্রামের জনাব মোঃ সিরাজুল ইসলাম এবং তলাগ্রামের ডা. সনাতন চন্দ্র দে। প্রথম জনের উদ্যোগ এবং শেষোক্ত দুইজনের অকুণ্ঠ পরিশ্রমের ফসল আজকের এই শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ। কলেজ প্রতিষ্ঠার যাবতীয় ব্যয় ভার বহন করেন জনাব আবদুল হাকিম এম.পি। তাঁর দেওয়া অর্থে জমি ক্রয় এবং ভবন নির্মাণের মত কাজগুলো সম্পন্ন করেন শেষোক্ত দুইজন। তাঁদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শাহ্‌ মোঃ খোরশেদ আলম, এম এ।
১৯৭২ সালে প্রথমে বর্তমান ডাক বাংলোর দুটি কক্ষ নিয়ে শুরু হয় কলেজের কার্যক্রম। পরবর্তীতে টিনের ছাউনী ও বাঁশের বেড়া দিয়ে নির্মিত ভবনে কলেজেটি স্থানান্তর করা হয়। প্রথমদিকে ছাত্র সংখ্যা কম থাকলেও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আজ ২০১৫ সালে বরুড়া শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ২৭০০ জন।

জাতীয়করণ:

প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ বছর পর ১৯৮৫ সালে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। এ আরেক চমকপদ্র ইতিহাস। বাংলাদেশে তখন উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বরুড়া থানা উপজেলাতে রূপান্তরিত হয়েছে। এ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কলেজেটি জাতীয়করণের আবেদন জানানো হয় রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এর নিকট। ০১/০৭/১৯৮৫ সালে এটি সরকারীকরণ করা হয়।

ছাত্রবাস নির্মাণ:

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কলেজের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ভবনটির উত্তর পাড়ে পুকুর ভরাট করা হয়। বাঁশের বেড়ার পরিবর্তে নির্মিত হয় টিনসেড ভবন। তৎকালীন এমপি জনাব এম.এ আবু তাহের এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় কলেজ ছাত্রাবাস। এতে প্রায় ৫০ জন ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। বর্তমানে ৪০ জন ছাত্র ছাত্রবাসে অবস্থান করে অধ্যয়ন করছে।

কলেজ মসজিদ নির্মাণ:

২০০৩ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলেও প্রায় ১০ বছর পর ২০১২ সালে কলেজের প্রবেশ গেটের ডানপ্বার্শে কলেজ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের পেছনে ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ আঃ মতিন, অধ্যক্ষ তুলসী দাস সাহা ও অধ্যক্ষ নবীদুল হক এবং সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অবদান অবিস্মরণীয়। এলাকাবাসী, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষ এতে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে।

কোর্স সমূহ :

অত্র কলেজটি বর্তমানে এইচএসসি ও স্নাতক পাস( বিএসএস ও বিবিএস) কোর্স চালু রয়েছে এবং বর্তমানে স্নাতক সম্মান কোর্স বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এ কলেজে মোট ১২টি বিষয়ে পাঠদান করা হয় তার মধ্যে মানবিক-৫টি, ব্যবসায় শিক্ষা-২ ও বিজ্ঞান-৫। বর্তমানে এইচএসসি ছাত্র-ছাত্রী সং ২০০০ এবং স্নাতক পাস ৭০০ জন। এ কলেজের বিভিন্ন বিভাগে ২৮টি শিক্ষক পদ থাকলেও বর্তমানে ২৩ জন সম্মানিত শিক্ষক কর্মরত আছেন। বিগত বছরগুলোতে বোর্ড এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় এ কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

পরিশেষে:

প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হলেও এখনো অনেক প্রতিকূল পরিবেশ রয়ে গেছে। শিক্ষক, ছাত্র ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা ও সচেতনতায় উক্ত কলেজ এ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও শিক্ষার তীর্থস্থান হয়ে উঠবে।